শিশুর মস্তিষ্কের ব্লুপ্রিন্ট

· Prothom Alo

মানবশিশুর জন্মকালে মস্তিষ্কের ওজন থাকে মাত্র ৩৫০ গ্রাম। অথচ মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এই মস্তিষ্কের ওজন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কেজি! আর ছয় বছর বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মস্তিষ্ক প্রায় পূর্ণবয়স্ক মানুষের ৯০ শতাংশ আকারে পৌঁছে যায়।

Visit milkshakeslot.com for more information.

স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে, শিশুর মাথার ভেতরে এমন কী ঘটে, যার ফলে এত অল্প সময়ে এমন বিশাল পরিবর্তন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে নিউরোপ্লাস্টিসিটিতে।

নিউরোপ্লাস্টিসিটি মানে মস্তিষ্কের নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। ছোট শিশুর মস্তিষ্ক যেন একধরনের জীবন্ত স্পঞ্জ। নতুন অভিজ্ঞতা, খেলা, ভাষা, স্পর্শ, সম্পর্ক—সবকিছুকে সে শুষে নেয় এবং তার গঠন বদলে ফেলে।

নিউরোপ্লাস্টিসিটি মানে মস্তিষ্কের নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা

জন্মের সময় শিশুর মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ থেকে ১০০ বিলিয়ন নিউরন থাকে। কিন্তু তখন এই নিউরনগুলোর মধ্যে কার্যকর সংযোগ থাকে খুবই কম। জন্মের পর থেকে শুরু হয় নিউরনগুলোর মধ্যে যোগাযোগের বিস্ময়কর যাত্রা।

একটি নিউরনের সঙ্গে আরেকটি নিউরনের এই সংযোগকে বলা হয় সিন্যাপস। জন্মের পর প্রথম দুই-তিন বছরে এই সিন্যাপস তৈরির হার হয় অনেক বেশি। প্রতি সেকেন্ডে তৈরি হয় হাজার হাজার নতুন সিন্যাপস। এই প্রক্রিয়ার নাম সিন্যাপটোজেনেসিস।

বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কতটুকু মস্তিষ্ক প্রয়োজন
নিউরোপ্লাস্টিসিটি মানে মস্তিষ্কের নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। ছোট শিশুর মস্তিষ্ক যেন একধরনের জীবন্ত স্পঞ্জ। নতুন অভিজ্ঞতা, খেলা, ভাষা, স্পর্শ, সম্পর্ক—সবকিছুকে সে শুষে নেয়।

কিন্তু সব সিন্যাপস শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। শিশু যখন ২ থেকে ১০ বছর বয়সে পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। একে বলে সিন্যাপটিক প্রুনিং। এর মানে, যেসব নিউরাল সংযোগ নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না, সেগুলো ধীরে ধীরে ছেঁটে ফেলা হয়, যাতে মস্তিষ্কে অপ্রয়োজনীয় কিছু না থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, এই সিন্যাপসগুলো শিশুর অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।

মা-বাবার সঙ্গে খেলাধুলার ফলে শিশুর মস্তিষ্ক উদ্দীপিত হয়

যেমন মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা বা খেলাধুলার ফলে শিশুর মস্তিষ্ক উদ্দীপনা পায়, ফলে সেসব কাজের সঙ্গে যুক্ত সিন্যাপসগুলো শক্তিশালী হয়। আর যে সংযোগগুলো ব্যবহার করা হয় না, সেগুলোই ছেঁটে ফেলা হয়। এই প্রক্রিয়া মস্তিষ্ককে আরও দক্ষ ও কার্যকর করে তোলে। অনেকটা অতিরিক্ত ডালপালা ছেঁটে একটি বাগানকে সুন্দর করে তোলার মতো।

সোজা কথায়, যে নিউরাল সংযোগ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়, সেগুলোই শক্তিশালী হয় এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। এটাই নিউরোপ্লাস্টিসিটির মূল কথা।

স্বাভাবিক মস্তিষ্ক বলে কিছু নেই
সিন্যাপটিক প্রুনিং বলতে বোঝায় যেসব নিউরাল সংযোগ নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না, সেগুলো ধীরে ধীরে ছেঁটে ফেলা হয়, যাতে মস্তিষ্কে অপ্রয়োজনীয় কিছু না থাকে।

মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়

জন্ম থেকে ৩ বছর বয়স পর্যন্ত প্রথম ১ হাজার দিন হলো শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড বা গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়েই মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ শতাংশ বিকাশ ঘটে। মস্তিষ্কের বিকাশ সাধারণত নিচ থেকে ওপরের দিকে হয়। প্রথমে সহজ সংযোগগুলো তৈরি হয়, এরপর সেই সহজ সংযোগগুলো মিলে তৈরি করে জটিল নেটওয়ার্ক।

জীবনের প্রথম বছরে মস্তিষ্কের আবেগের কেন্দ্র ব্রেন স্টেম ও লিম্বিক সিস্টেমের বিকাশ ঘটে। ২-৩ বছর বয়সে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার সিস্টেমের বিকাশ শুরু হয়। তাই শিশু প্রথম দিকে শুধু চোখ খোলে এবং শব্দ শুনে প্রতিক্রিয়া দেয়। এরপর ধীরে ধীরে সে হাঁটা, কথা বলা, খেলা করা এবং সামাজিক আচরণ করতে শেখে।

হাত-পা নাড়ানো, চোখের প্রতিক্রিয়া—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো শিশুর মস্তিষ্কের জন্য বড় ভিত্তি গড়ে দেয়

প্রথম তিন বছরের মধ্যে শিশুর মস্তিষ্কে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক মিলিয়নেরও বেশি নতুন সংযোগ তৈরি হয়! এই সংযোগগুলোই শিশুর শেখার মূল ভিত্তি। শক্তিশালী সংযোগ থাকলে শিশুর শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ এবং সামাজিক দক্ষতা ভালো হয়। হাত-পা নাড়ানো, চোখের প্রতিক্রিয়া, শব্দ শুনে হাসি বা কান্না—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই মস্তিষ্কের জন্য বড় ভিত্তি গড়ে দেয়। ছোট বয়সে মস্তিষ্কের প্লাস্টিসিটি বেশি থাকে বলে শিশুরা নতুন ভাষা বা দক্ষতা খুব দ্রুত শিখতে পারে। একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ শিশুর মস্তিষ্ককে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। বিপরীতভাবে, পরিবেশ ভালো না হলে মস্তিষ্কে তার স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

হার্ভার্ডের সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ডের মতে, মস্তিষ্কের বিকাশ হলো জিন ও অভিজ্ঞতার যৌথ ফল। জিন মস্তিষ্কের একটি প্রাথমিক নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে দেয় ও পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা সেই নকশায় রং ফোটায়।

অচেনা রাস্তায় মস্তিষ্ক কীভাবে নতুন পথ খুঁজে নেয়
জীবনের প্রথম বছরে মস্তিষ্কের আবেগের কেন্দ্র ব্রেন স্টেম ও লিম্বিক সিস্টেমের বিকাশ ঘটে। ২-৩ বছর বয়সে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার সিস্টেমের বিকাশ শুরু হয়।

মস্তিষ্ক গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়

সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন হলো শিশু ও বড়দের মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া। শিশু যখন কিছু করে—যেমন হাসে, কাঁদে বা হাত নাড়ে—সেটিকে বলে সার্ভ। আর বড়রা যখন তাতে সাড়া দিয়ে হাসে, কথা বলে বা আদর করে, তখন সেটিকে বলে রিটার্ন।

মা-বাবা যদি শিশুর সঙ্গে কথা বলেন, চোখে চোখ রেখে হাসেন, তাহলে তার ভাষা ও আবেগের কেন্দ্র শক্তিশালী হয়

এই পারস্পরিক আদান-প্রদানই মস্তিষ্কের সংযোগ গড়ে তোলে। ঠিক যেমন টেনিস খেলায় বল ছুড়লে ওপাশ থেকে সাড়া না পেলে খেলা থেমে যায়, আর দুপাশ থেকে সমান সাড়া পেলে খেলা জমে ওঠে, ব্যাপারটা তেমনই। হার্ভার্ডের গবেষকদের মতে, এই সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন ঠিকমতো না হলে মস্তিষ্কের গঠনকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। আর মা-বাবা যদি শিশুর সঙ্গে কথা বলেন, চোখে চোখ রেখে হাসেন, তাহলে তার ভাষা ও আবেগের কেন্দ্র শক্তিশালী হয়। শিশুর আচরণ লক্ষ করে সাড়া দেওয়া, তাকে নাম ধরে ডাকা, গান শোনানো বা একসঙ্গে খেলার মতো সাধারণ কাজগুলোই তার মস্তিষ্ককে মজবুত করে তোলে।

মানুষের মস্তিষ্ক কোনটিকে বেশি ঝুঁকি মনে করে, বাঞ্জি জাম্পিং নাকি চাকরি হারানো
শিশু যখন কিছু করে—যেমন হাসে, কাঁদে বা হাত নাড়ে—সেটিকে বলে সার্ভ। আর বড়রা যখন তাতে সাড়া দিয়ে হাসে, কথা বলে বা আদর করে, তখন সেটিকে বলে রিটার্ন।

শিশুর মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় বিস্ময়

হার্ভার্ডের গবেষণা বলছে, শিশুর সঙ্গে যত বেশি কথা বলা হয়, তার শব্দভান্ডার বা ভোকাবুলারি তত বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর সঙ্গে দিনে অন্তত দুই হাজার শব্দ বলা হয়, তাদের মস্তিষ্কের ভাষা ৩০ শতাংশ বেশি শক্তিশালী হয়। শিশুকে একাধিক ভাষা শেখালে মস্তিষ্ক আরও বেশি লাভবান হয় এবং কগনিটিভ রিজার্ভ বাড়ে। এ সময় মস্তিষ্কের কথা বলার অংশ এবং কথা বোঝার অংশের মধ্যে দ্রুত সংযোগ গড়ে ওঠে। ১৬ মাস বয়সে শিশুর মস্তিষ্কে ইনহিবিটরি কন্ট্রোল বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। ভাষা শেখার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি। সবকিছু ঠিক থাকলে ১ বছর বয়সে একটি শিশু গড়ে ৫০টি শব্দ এবং ২ বছরে ২০০-৩০০ শব্দ বলতে পারে।

মস্তিষ্কের সেরা ব্যায়াম

খেলাধুলা শুধু মজার বিষয় নয়, এটি মস্তিষ্কের ব্যায়ামাগার। হার্ভার্ডের মতে, খেলার মাধ্যমেই শিশুর মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বিকশিত হয়।

ব্লক দিয়ে কোনো কিছু বানানোর মতো খেলাগুলো শিশুর কল্পনাশক্তি বাড়ায়

যেমন, লুকোচুরি খেলা শিশুকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। আবার ব্লক দিয়ে কোনো কিছু বানানো বা গল্প বলার মতো খেলাগুলো শিশুর কল্পনাশক্তি বাড়ায়। এর মধ্যে ফ্রি প্লে বা শিশুর নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে খেলা সবচেয়ে বেশি উপকারী। তবে ডিজিটাল ডিভাইসে খেলা মস্তিষ্কের জন্য বেশ ক্ষতিকর। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মস্তিষ্ক মাঝেমধ্যে হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায় কেন
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর সঙ্গে দিনে অন্তত দুই হাজার শব্দ বলা হয়, তাদের মস্তিষ্কের ভাষা ৩০ শতাংশ বেশি শক্তিশালী হয়। শিশুকে একাধিক ভাষা শেখালে মস্তিষ্ক আরও বেশি লাভবান হয়।

মস্তিষ্কের শত্রু

অনেক সময় মস্তিষ্কের বিকাশ থমকে যেতে পারে, এমনকি সংকুচিতও হতে পারে। শিশু যদি দীর্ঘ সময় ধরে অত্যধিক মানসিক চাপ, ভয় বা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠে, তবে তার মস্তিষ্কের কিছু সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় টক্সিক স্ট্রেস। এর কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে মস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ছোট হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী জীবনে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন বা শেখার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দেয়। তবে বড়দের সঙ্গে শিশুর সুন্দর ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক এই ক্ষতিকর স্ট্রেসকে অনেকটাই প্রশমিত করতে পারে।

শিশু যদি দীর্ঘ সময় ধরে অত্যধিক মানসিক চাপে থাকে, তবে তার মস্তিষ্কের কিছু সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়

মানব মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল ও বিস্ময়কর যন্ত্র। শেখা, চিন্তা, আবেগ ও সামাজিক আচরণের মূল কেন্দ্র এটি। এর বিকাশ জন্মের পর নয়, বরং গর্ভাবস্থার প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে আয়রন, ওমেগা-৩ ও আয়োডিনের ঘাটতি হলে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। জন্মের পর প্রথম তিন থেকে পাঁচ বছর মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় দ্রুতগতিতে নতুন নিউরাল সংযোগ তৈরি হয়। প্রথম বছরে স্তনপান, মায়ের কোলে থাকা, আদর ও কথা বলা শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন হরমোন বাড়ায়। এই বয়সের অভিজ্ঞতাই মূলত একজন মানুষের ভবিষ্যৎ মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে দেয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স, চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল রিলেশনশিপসূত্র: সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্রমস্তিষ্ক যেভাবে ভয় শনাক্ত করে

Read full story at source