দৈনন্দিন জীবনে এআই: আমরা কি বুঝেই ব্যবহার করছি?

· Prothom Alo

একটি সাধারণ সকাল, অদৃশ্য এক সঙ্গী

সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি হাত বাড়িয়ে মুঠোফোনটা তুলে নিলেন। অ্যালার্ম বন্ধ করলেন, তারপর অভ্যাসবশত ফেসবুক দেখতে শুরু করলেন। প্রথমেই চোখে পড়ল এমন কিছু পোস্ট, যা আপনার খুব পছন্দের। প্রিয় লেখকের লেখা, কাছের বন্ধুর ছবি আর আপনার আগ্রহের কোনো বিষয় নিয়ে ভিডিও।

একবারও কি ভেবেছেন, এগুলো এত মিলে যায় কীভাবে?
আমরা অনেকেই মনে করি, এটা কাকতালীয়। কিন্তু আসলে তা নয়। আমাদের প্রতিটি লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, এমনকি কতক্ষণ কোন পোস্টের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, সেটাও বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্সের মতো মাধ্যমগুলো জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে আমাদের পছন্দের জগৎ তৈরি করে দেয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজেরাই বেছে নিচ্ছি, নাকি আমাদের জন্য বেছে দেওয়া হচ্ছে?

Visit asg-reflektory.pl for more information.

সার্চ বক্সের ভেতরে যে অদৃশ্য বুদ্ধি

ধরুন, আপনি হঠাৎ লিখলেন, ‘পিকনিকে কোথায় যাওয়া যায়?’
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অসংখ্য সাজেশন চলে এল। আপনার শহরের কাছাকাছি কিছু জায়গা, রিভিউসহ রিসোর্ট, এমনকি ব্লগ লিংকও।
গুগল শুধু আপনার লেখা শব্দটাই দেখে না। এটি দেখে আপনার অবস্থান, আগের সার্চ, কোন যন্ত্র ব্যবহার করছেন, এমনকি আপনি সাধারণত কোন ধরনের জায়গা পছন্দ করেন ইত্যাদি। আপনি যদি আগে পাহাড় নিয়ে বেশি সার্চ করে থাকেন, তাহলে হয়তো সমুদ্রের চেয়ে পাহাড়ের সাজেশনই বেশি পাবেন।

রাস্তায় বের হলেই যে অদৃশ্য গাইড

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আপনি ম্যাপ খুললেন। কোথায় যানজট, কোন রাস্তা দ্রুত হবে—সব দেখাচ্ছে পরিষ্কারভাবে। গুগল ম্যাপস শুধু মানচিত্র নয়। এটি লাখ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে রিয়েল টাইমে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—কে কত গতিতে চলছে, কোথায় গাড়ি থেমে আছে, কোন রাস্তায় চাপ বেশি।
আপনি ভাবছেন, এই রাস্তাটা ফাঁকা।
আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আগেই হিসাব করে রেখেছে।

রাত জেগে দেখা সিরিজ, নাকি সুপরিকল্পিত প্রলোভন

একদিন ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখলেন। এরপর আরেকটা। তারপর আরেকটা। হঠাৎ দেখলেন, এক ঘণ্টা কেটে গেছে।
ইউটিউব ও নেটফ্লিক্সের ‘রিকমেন্ডেড ফর ইউ’ ফিচার আসলে অত্যন্ত শক্তিশালী রেকমেন্ডেশন সিস্টেমের ফল। আপনি কী দেখেছেন, কতক্ষণ দেখেছেন, কোথায় থেমেছেন, কী এড়িয়ে গেছেন—সব বিশ্লেষণ করে তারা পরের কনটেন্ট সাজায়।

এখানে প্রশ্নটা একটু গভীর

আমরা কি সত্যিই নিজের ইচ্ছায় দেখছি, নাকি আমাদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য সাজানো এক ডিজিটাল পরিবেশে হাঁটছি? একদিন হঠাৎ আপনার ফোনে মেসেজ এল,‘আপনার ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য শহরে লেনদেনের চেষ্টা হয়েছে।’ আপনি অবাক। আপনি তো বাড়িতেই আছেন।
এখানে এআই কাজ করছে আপনার নিরাপত্তার জন্য। সন্দেহজনক প্যাটার্ন দেখলেই তা শনাক্ত করে সতর্কবার্তা পাঠায়। আগের লেনদেনের ধরন, সময়, স্থানসহ সব বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কিছু হলে তা ধরে ফেলে। কিন্তু এখানেও একটা প্রশ্ন—যে সিস্টেম আমাকে এত ভালোভাবে চেনে, সে আমার সম্পর্কে কতটা জানে?

কেন একই বিষয় বারবার সামনে আসে?

আপনি অনলাইনে একটা বই দেখলেন। কিনলেন না। কয়েক ঘণ্টা পর দেখলেন, সেই বইয়ের বিজ্ঞাপন আবার সামনে।
এটা কি কাকতালীয়? ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো আপনার আচরণ বিশ্লেষণ করে। আপনি কী দেখেছেন, কতক্ষণ দেখেছেন, কার্টে রেখেছেন কি না, সবই হিসাব করা হয়। অ্যামাজন বা দারাজের মতো মাধ্যমগুলো এআই ব্যবহার করে বিক্রির সম্ভাবনা বাড়ায়। তাহলে আমরা কি পণ্য খুঁজছি, নাকি পণ্য আমাদের খুঁজে নিচ্ছে?

হাসপাতালের নীরব সহকারী

স্বাস্থ্য খাতে এআইয়ের ব্যবহার আরও সংবেদনশীল। একটি এক্স-রে বা এমআরআই ছবিতে মানুষের চোখে যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরা পড়ে না, এআই তা শনাক্ত করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণও আগে ধরা পড়ছে।
চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু এআই সাহায্য করে বিশ্লেষণে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কি প্রযুক্তির ওপর ভরসা করছি, নাকি ধীরে ধীরে তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি?

বাংলাদেশে এআইয়ের পথচলা

বাংলাদেশেও এআই ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। ফিনটেক, টেলিযোগাযোগ, ই-কমার্স, এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখন মেশিন লার্নিং ও ডেটাসায়েন্স পড়ানো হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব ডেটা বা তথ্য নিয়ে কাজ করছেন।
অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীর শেখার গতি বিশ্লেষণ করে কনটেন্ট সাজায়। কেউ যদি একটি অধ্যায়ে বারবার ভুল করে, সিস্টেম বুঝে যায়, তার দুর্বলতা কোথায়। কিন্তু আমরা কি জানি, আমাদের শেখার অভ্যাসও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে?

সুবিধা নাকি ঝুঁকি

এআই আমাদের জীবন সহজ করেছে। সময় বাঁচাচ্ছে। সিদ্ধান্ত দ্রুত নিচ্ছে। নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে। কিন্তু এর অন্য দিকও আছে। আমরা প্রায়ই অ্যাপ ইনস্টল করার সময় শর্তাবলি পড়ি না। আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য, লোকেশন, কনট্যাক্ট, ব্রাউজিং অভ্যাস সবই শেয়ার করি অজান্তে। হ্যাকাররাও এআই ব্যবহার করছে আরও উন্নত ফিশিং আক্রমণের জন্য। আপনার পছন্দ অনুযায়ী তৈরি বার্তা পেলে আপনি কি বুঝতে পারবেন সেটি ভুয়া?

তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ভবিষ্যৎ নয়, এটি আমাদের বর্তমান। প্রশ্নটা প্রযুক্তিকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আমাদের সচেতনতা নিয়ে। আমরা কি জানি কোন অ্যাপ কী তথ্য নিচ্ছে? আমরা কি বুঝি কেন কিছু কনটেন্ট আমাদের সামনে বারবার আসে?
আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করছে?
এআই খারাপ নয়। এটি নিরপেক্ষ একটি শক্তি। আমরা যেমনভাবে ব্যবহার করব, ফলাফল তেমনই হবে।
আমাদের দরকার তিনটি বিষয়—
* সচেতনতা
* তথ্যের নিরাপত্তা
* নৈতিক বোঝাপড়া

আমরা যদি বুঝে ব্যবহার করি, তাহলে এআই হবে আমাদের সহকারী। না বুঝে ব্যবহার করলে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক।
শেষে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন রেখে দিই। আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন আবার ফোন হাতে নেবেন, তখন কি একবার ভাববেন, এই পর্দার পেছনে কে কাজ করছে? হয়তো তখনই আমাদের ব্যবহারটা একটু সচেতন হয়ে উঠবে।

ইসরাত জাহান: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী

Read full story at source