ইরানকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অর্ধশতক বছর ধরে একটি অভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। আর তা হলো মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোকে হয় নিজেদের প্রভাববলয়ে নিয়ে আসা; অথবা যাদের আনা যাবে না, তাদের ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে দুর্বল করে ফেলা। ইরাকে মার্কিন যুদ্ধ সেই পরিকল্পনার অংশ। এরপর লিবিয়া, সুদান, সিরিয়া। উপসাগরের আরব দেশগুলো নিজ আগ্রহেই ইসরায়েলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। বাকি ছিল ইরান। এখন সেটিকে বাগে আনার কাজ প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছে।
Visit catcross.biz for more information.
মার্কিন-ইসরায়েলি তরফ থেকে অবশ্য ভিন্নকথা বলা হয়েছে। কেন এই যুদ্ধ, তার ব্যাখ্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ পর্যন্ত আধা ডজনের মতো কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমে বলা হলো, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রাগার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য ‘আশু হুমকি’। অথচ ছয় মাস আগে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সে যুক্তি ধোপে টিকছে না দেখে তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্পের কথা বললেন। এখনই যদি না ধ্বংস করা হয়, তাহলে সে মিসাইল সমুদ্র পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানবে।
অথচ খোদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীই বলেছেন, ইরানের সে সক্ষমতা অর্জন করতে কম করে হলেও আরও আট বছর লাগবে। ট্রাম্প কংগ্রেসের নেতাদের এমন কথাও বললেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে ইরান আমাদের জন্য হুমকি হয়ে থেকেছে।’ তাঁর আগে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট ইরানকে মোকাবিলায় সক্ষম হননি। তিনি এবার ইরান সমস্যার শেষ করেই ছাড়বেন। যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে ‘রেজিম চেঞ্জের’ কথাও জানালেন।
এসবের কোনোটাই খুব যুক্তিপূর্ণ কথা নয়। মার্কিন রাজনীতিকেরাই সেসব বাখোয়াজ বলে বাতিল করে দিয়েছেন। সত্যিটা বেরিয়ে এল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মুখ ফসকে বলা একটা কথা থেকে। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানালেন, ‘আসলে আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই হামলা চালিয়েছি; কারণ, আমরা জানতাম ইসরায়েল ইরানে হামলা করতে উদ্যত। এমন হামলা হলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের সৈন্যদের ওপর হামলা করত। তাতে আমাদের বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হতো। আমাদের জানানো হয়েছিল, পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মতভেদ অনেকটা কমিয়ে এনেছে।’ ২৭ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর আগের দিন, ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, সোমবার ভিয়েনায় পরবর্তী ধাপের আলাপ-আলোচনা চলবে। তিনি সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি জানান, উভয় পক্ষ সমাধানের খুব কাছে চলে এসেছে। তবে সাফল্যের জন্য কূটনীতিকে জায়গা দিতে হবে।
কেন ইরানে হামলা
কামানের গোলা হাতে এক ইসরায়েলি সেনাতাহলে এমন কী হলো যে তড়িঘড়ি করে হামলা চালাতে হলো? এর ব্যাখ্যাটি দিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। তারা জানাচ্ছে, পেছনের কলকাঠি নেড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তাঁর যুক্তি ছিল, সামরিক হামলাই ‘ইরান প্রশ্ন’ চিরতরে শেষ করার একমাত্র যৌক্তিক পথ। প্রথমে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্লাবে এবং পরে হোয়াইট হাউসে তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় সে কথা ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন নেতানিয়াহু। তাঁর আবদার ছিল, একা ইসরায়েল নয়, যুক্তরাষ্ট্রকেও এই হামলায় অংশ নিতে হবে। তাঁর অনুরোধে হামলার তারিখটাও জানুয়ারি থেকে এগিয়ে ফেব্রুয়ারিতে আনা হয়; কারণ, ইরানের পাল্টা ড্রোন হামলা ঠেকাতে যে পরিমাণ ‘ইন্টারসেপ্টারের’ প্রয়োজন, তাদের অস্ত্রাগারে তা মজুত ছিল না। ট্রাম্প সে কথা মেনে নেন এবং হামলা বিলম্বিত করতে সম্মত হন। নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন। সেটি ছিল তাঁর জন্য মস্ত সাফল্য।
ইরানের ছোড়া ক্লাস্টার মিউনিশনযুক্ত একটি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইসরায়েলের দিকে উড়ে যাচ্ছে। ৫ মার্চ ২০২৬ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ যে এক সুতায় গাঁথা, তা নতুন কোনো কথা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে, মার্কিন কূটনীতি ও রণনীতি বাস্তবায়নে চালকের আসনটি ইসরায়েলের। এ নিয়ে বিস্তর লিখেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ‘বাস্তববাদী’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ার্শহাইমার। ২০০৭ সালে অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্টের সঙ্গে যৌথভাবে লিখিত ইসরায়েল লবি ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি গ্রন্থে খোলামেলাভাবেই তিনি বলেছেন, এ দেশে ইসরায়েল লবির প্রভাব এত প্রবল যে অনেক সময় মার্কিন স্বার্থের বদলে ইসরায়েলের স্বার্থকে সামনে রেখে নীতিনির্ধারণ করা হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে ইরানকে। সৌদি থেকে উপসাগরের অধিকাংশ দেশ ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে মিতালিতে আবদ্ধ। অবশিষ্ট এই ইরানকে কবজা করা গেলে এই অঞ্চলে তার আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ থাকবে না। মিয়ার্শহাইমারের কথায়, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই এই যুদ্ধ চায় না, যুদ্ধ চায় ইসরায়েল ও তার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
কিন্তু ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। ইরান প্রায় সাড়ে ৯ কোটি মানুষের দেশ, সে অর্থনৈতিকভাবে ধনী ও সামরিকভাবে শক্তিশালী। শুধু আকাশ থেকে বোমা মেরে এই দেশকে কাবু করা সহজ নয়। ‘রেজিম চেঞ্জের’ যে কথা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, সেটাও খুব সহজ নয়। এর জন্য চাই পদাতিক সৈন্য বাহিনী, যারা কাবু দেশটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে ও অনুগত সরকারকে ক্ষমতায় বসাবে।
বস্তুত ১৯৪৫ সালে জাপানে পারমাণবিক বোমা মেরে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা ছাড়া শুধু আকাশযুদ্ধে কোনো দেশ জয়ের উদাহরণ নেই। ইরানকে বোমা মেরে মধ্যযুগে ঠেলে পাঠালেও সেখানে ‘অটোমেটিক’ শাসনক্ষমতার পরিবর্তন না–ও হতে পারে। ট্রাম্পের মাথায় রয়েছে ভেনেজুয়েলা মডেল, সেখানে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ধরে জেলে পুরেছেন, তাঁর জন্য সেটাই মস্ত জয়। কিন্তু সে দেশের সরকারব্যবস্থাকে তিনি বদলাতে পারেননি। মাদুরোর নিজ দলের লোকেরাই সেখানে ক্ষমতায়। ইরানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভাব নেই, কিন্তু কোনো একজন বা কোনো একটি দলকে নিয়ে তিনি কাজ করবেন, তেমন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দেখা দেয়নি। ফলে চাই বিকল্প ব্যবস্থা। আর সেই বিকল্প ব্যবস্থা হলো, দেশটিকে একাধিক দল-উপদলে বিভক্ত করা, যাতে তারা নিজেরাই একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে নিজেরাই মরে।
এটি যে আমার অলস কল্পনা নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই সে কথা বলেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, ইরানি কুর্দিদের সঙ্গে একযোগে হামলার জন্য সিআইএ ইরাকের কুর্দিদের প্রস্তুত করছে। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই কথা বলেছেন ইরাকের মার্কিনপন্থী কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানি ও বাফেল তালাবানির সঙ্গে।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, এই কুর্দিদের যদি লেলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বর্তমান ইরানের সামরিক বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা সহজ হবে। পত্রিকাটি অবশ্য এ কথা স্বীকার করেছে, ব্যাপারটা খুব সহজ হবে না। মুখে সাহায্যের কথা বললেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি কুর্দিদের ভারী অস্ত্র, বিমান বা ট্যাংক দিয়ে সাহায্য করেনি। এসব অস্ত্র ব্যবহারে কুর্দি বিদ্রোহীদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এখানে মনে রাখা ভালো, ইরান দেশটা ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। ফার বা ফারসিরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাদের করায়ত্ত। অধিক রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অধিকারের দাবিতে ফারসিদের সঙ্গে কুর্দি, আজেরি ও বালুচ—এই তিন জাতির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। একই রকম জাতিগত দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো দেশকে বিভক্ত করা হয়েছে। ইরানেও একই রণনীতি অনুসরণে আগ্রহী ইসরায়েল। ইরানের ইসলামি শাসকেরা নিজ দেশে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন, সেটাও এই সমীকরণে সংযুক্ত।
বিভক্ত করো, দুর্বল করো
একাধিক ইসরায়েলি রাজনীতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব অনেক আগে থেকেই ইরান ও অন্যান্য আরব দেশকে বিভক্ত করার মাধ্যমে দুর্বল করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে আসছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ওদেদ ইয়ানন। আশির দশকে তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন, নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই ইসরায়েলের উচিত হবে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলা। তাঁর যুক্তি ছিল, অটোমান সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেসব স্বাধীন আরব দেশ গঠিত হয়েছে, তা আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম। তাসের দেশের মতো এই দেশগুলোও ভেঙে ফেলা যায়, আর সেটাই হবে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান রণনীতি। সাবেক ইসরায়েলি জেনারেল গিয়োরা ইলান্দ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত একটি দেশ, এদের মধ্যে যদি পারস্পরিক লড়াইটা উসকে দেওয়া যায়, তাহলে ইসরায়েলেরই লাভ।
সেই লক্ষ্যে প্রথম কদম হলো কুর্দিদের দলে ভেড়ানো। বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে ট্রাম্প বলেন, তাহলে ব্যাপারটা চমৎকার হবে।
এ রকম ভ্রাতৃঘাতী লড়াইতে লিবিয়া গেছে, সুদান গেছে, লেবানন গেছে, সিরিয়া গেছে, এমনকি ইরাকও সে পথে। ইরানের বর্তমান শাসনকে যদি এক ধাক্কায় ফেলে দেওয়া না–ও যায়, তাদের ঘরের ভেতরেই যদি গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আখেরে কার লাভ, তা বুঝতে রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না।