২০০ বছরের পুরোনো কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী
· Prothom Alo

বইমেলায় প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে এ আয়োজন। আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রুমিন ফারহানার সংসদের দিনগুলি: একাদশ সংসদে সাড়ে তিন বছর বইটি আনছে প্রথমা প্রকাশন। বইটির প্রথম অধ্যায় এখানে মুদ্রিত হলো। যেখানে উঠে এসেছে কারাগারের কোর্টরুমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎ আর নিজের শৈশবে বাবার কারাগার-স্মৃতি।
Visit catcrossgame.com for more information.
২০১৯ সাল। একাদশ সংসদ নির্বাচন মাত্র শেষ হয়েছে। রাজনীতিতে হতবিহ্বল ভাব। কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী হলো এটা। জয়ী-বিজিত কোনো পক্ষই স্বস্তিতে নেই। সে সময় প্রতি সপ্তাহে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতাম আমি। যেতাম দেশনেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলায়, যেতাম ওনাকে কাছ থেকে দেখতে। উনি তখন ২০০ বছরের পুরোনো সেই বিশাল কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পড়ত মামলার তারিখ। মামলার দিনগুলোতে নিচতলায় বসা কোর্টে আনা হতো ওনাকে। হুইলচেয়ারে আসতেন তিনি। যে মানুষটিকে জেলে যাওয়ার আগের দিনও স্বাভাবিকভাবে হেঁটে গাড়িতে উঠতে দেখেছি আমি, সেই মানুষটি নিজের পায়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। এটা যে কত বড় ধাক্কা ছিল আমাদের জন্য, সেটি বলে বোঝানো কঠিন।
ছোট্ট ওই কোর্টরুমে পুলিশ, আইনজীবী আর সাংবাদিক গিজগিজ করত, সঙ্গে তো গোয়েন্দা সংস্থার লোক আছেই। উনি এলে আমি গিয়ে দাঁড়াতাম ঠিক ওনার হুইলচেয়ারটার পাশে। খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে যতটুকু সম্ভব খবর দেওয়ার চেষ্টা করতাম তাঁকে। উনি বলতেন খুবই কম, শুনতেন বেশি। কিছু বলতে চাইলে হুইলচেয়ারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তাম আমি, যাতে পুলিশের কান বাঁচিয়ে কথাগুলো শুনতে পারি। পুরোটা সময়ই তাঁকে ঘিরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকত মহিলা পুলিশ। তাদের কান বাঁচিয়ে কথা বলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এর মধ্যেই কথা চালিয়ে যেতাম যতটুকু পারি। তিনি কিছু নির্দেশ আমাকে দিতেন সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে বলার জন্য, সেগুলো আমি তাঁদের জানাতাম। মামলার শুনানি শেষ হলে ওই দিনের মতো কারাগারের ভেতর নিয়ে যাওয়া হতো তাঁকে। এ সময়টা আমি তাঁর পাশ থেকে সরে যেতাম। দাঁড়াতাম ভেতরের মূল ফটকের পাশে, যেখান দিয়ে যাবেন তিনি। শেষবারের মতো একবার তাকাতেন। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। হাসতেন কখনো কখনো একটু, যেন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যে মানুষটিকে আমি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে কোর্টে যেতে দেখেছি, কী করে এক মাসের ব্যবধানে তিনি চলনশক্তি হারালেন, তা আজও আমার কাছে এক বিস্ময়। একদিন হয়তো এই সত্য প্রকাশ পাবে। অনাগত কালের কোনো প্রজন্ম হয়তো উদ্ঘাটন করবে এই সত্যগুলো। জানবে কেমন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি।
সে সময় প্রতি সপ্তাহে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতাম আমি। যেতাম দেশনেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলায়, যেতাম ওনাকে কাছ থেকে দেখতে। উনি তখন ২০০ বছরের পুরোনো সেই বিশাল কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী।
যা-ই হোক, ফিরে আসি আগের কথায়। তাঁকে সেখানে একা রেখে ঘরে ফেরার যে তীব্র কষ্ট, সেটি কি বুঝতে পারতেন তিনি? না হলে কেন মৃদু হাসি দিয়ে আশ্বস্ত করার এই চেষ্টা ছিল তাঁর? প্রতিশোধ আর জিঘাংসার রাজনীতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত কত ঘৃণ্য হতে পারে, তার উদাহরণ হয়ে থাকবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আওয়ামী সরকারের নির্মম আচরণ। সেই সঙ্গে অন্যায়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করে ৭৬ বছর বয়সে সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কারাগারকে বেছে নেওয়ার যে দৃষ্টান্ত বেগম জিয়া তৈরি করলেন, সেটিও লেখা থাকবে ইতিহাসে। তিনি চাইলেই পারতেন আপস করতে, কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে, পারতেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা হতে, ২০১৮ সালে বিদেশ থেকে না ফিরতে। কিন্তু ১/১১ সরকারের সময়ই বেগম জিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই দেশ ছাড়া তাঁর কোথাও আর কিছু নেই, এই দেশের মানুষই তাঁর সব।
বেগম খালেদা জিয়ার মামলার সুবাদে বহু বছর পর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে মনে হয়েছিল কিছুই ভুলিনি আমি। এরশাদ সরকারের সময় যখন আমি নিতান্তই একজন শিশু, তখন বাবাকে দেখতে বহুবার যেতে হয়েছে কারাগারে। পুরোনো সেই স্মৃতি মিলিয়ে দেখি বদলায়নি কিছুই। এমনকি বিল্ডিংয়ের ভেতরের সেই হলুদ রংটাও না। নোনাধরা দেয়ালগুলোও আছে ঠিক আগের মতোই। লোহার গরাদ বসানো সেই জানালাগুলোও পাল্টায়নি কেউ। যেন ২০০ বছরের কালের সাক্ষীকে একইভাবে রাখতে হবে যত দিন রাখা যায়। লোহার দরজা দিয়ে ঢুকেই হাতের ডানে প্রথমে জেলারের রুম। এরপর মোটামুটি বড় একটা ঘর (যেখানে আদালত বসত), তারপরই আরেকটা লম্বা টানা ঘর, যার এক পাশে সারি সারি জানালা, যেখান দিয়ে বাইরে তাকালে জেলের ভেতরটা অনেকখানি দেখা যায়। ভেতরটা যত দূর দেখা যায় সবুজ, সুন্দর। ছোট-বড় মিলিয়ে গাছের কমতি নেই। আসলে এতবার গেছি এই কেন্দ্রীয় কারাগারে যে ভোলা অসম্ভব। বাবাকে রেখে আসার সময় প্রতিবার একটা শূন্যতা, একটা তীব্র কষ্ট, হাহাকার কাজ করত। মনে হতো, আবার কবে দেখব? বাবাকে ছাড়া বাড়িটা কেমন সব সময় খালি খালি মনে হতো। ছোট আমি হয়তো বুঝিয়ে সবটা বলতে পারতাম না, কিন্তু বাবা জেলে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়তাম। হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই ভীষণ জ্বর, নয়তো পড়ে গিয়ে ব্যথা পাওয়া। মা বলতেন, বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে নাকি আমাকে নিয়ে ভয়ে থাকতেন বেশি—এই বুঝি কিছু একটা হয়। প্রতিবার হতোও তা-ই। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তখনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজবন্দীদের সঙ্গে অসদাচরণ আজকের মতো এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই বাবা গ্রেপ্তার হলে কখনো আর না-ও ফিরতে পারেন—এমন ভয় মা কিংবা আমি কখনো পাইনি। স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদের পর আর কোনো সরকার জেলে নেয়নি বাবাকে। আর এ কারণেই আমার জীবনে ’৯০-এ এরশাদের পতন অতি আনন্দময় ঘটনাগুলোর একটি।
রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে সব দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানোর খেলাও পুরোনো। রাজনীতিবিদদের দোষত্রুটি আছে, ভুলভ্রান্তি আছে, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও রাজনীতিবিদের বিকল্প কেবল রাজনীতিবিদই, অন্য কেউ নয়।
বাবা যখন জেলে থাকতেন, তখন বাসায় কেবল ছোট্ট আমি, মা আর কর্মচারীরা। সকালে মা চলে যেতেন অফিসে। সারা দিন আমি একা। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। কবির ভাই (রান্না করতেন), জয়নাল ভাই (বাসা দেখাশোনা), বাবুল ভাই (ড্রাইভার) কিংবা রওশনের মা যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পরিবারের সদস্যের চেয়ে বেশি বৈ কম ছিলেন না। ছোট্ট আমাকে যেভাবে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখে বড় করেছেন তাঁরা, আজকের দিনে এমনটা চিন্তাও করা যায় না। জয়নাল ভাইয়ের বড় মেয়ে ছিল আমার বয়সী। অজপাড়াগাঁয়ে রেখে আসা শিশুকন্যাটির প্রতি জমিয়ে রাখা সব স্নেহ ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনির মতোই ঢেলে দিয়েছিলেন আমার প্রতি। আমার মা ছিলেন খুব কড়া মেজাজের আর শক্ত ধাঁচের মানুষ। তার ওপর সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক পরিবার থেকে এসে স্বামীর রাজনীতি, জেলজীবন—সবকিছু মানিয়ে নিয়ে একা সংগ্রামের ধকল তো ছিলই। মায়ের শাসন আর বকুনি থেকে আমাকে বাঁচাতে কত চেষ্টা যে ছিল জয়নাল ভাইয়ের। মাকে আমরা সবাই ভীষণ ভয় পেতাম। কেউ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। তার ওপর অতি দুষ্টু বাচ্চা বলতে যা বোঝায়, আমি ছিলাম তা-ই। বাবা জেলের বাইরে থাকলে বাবা আর না থাকলে এই চারজন কতবার যে আমার হয়ে মিথ্যা দোষ কবুল করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। মাকে নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা মজার কথা প্রচলিত ছিল। আমরা বলতাম, মা বাসায় থাকলে ভুলেও বাড়িতে কাক-চিল বসে না। তবে মজার বিষয় হলো, ঘরের বাইরে মা ছিলেন অতি মার্জিত, ভদ্র, কঠোর কিন্তু শান্ত মেজাজের মানুষ।
বাবা ছিলেন গৌরবর্ণের ঋষি পুরুষ। জেলের ভেতর দেখা করার সময় পার হলে সোজা হেঁটে যেতেন ভেতরে, যেন পেছনে কেউ নেই, কিছু নেই। আজ মনে হয়, হয়তো কষ্ট হতো তাঁর পেছনে ফিরে দেখতে, যেখানে চিন্তিত-বিষণ্ন স্ত্রী, শিশুকন্যা দাঁড়িয়ে আছে। রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে সব দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানোর খেলাও পুরোনো। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ আর তাঁর পরিবারই শুধু জানে ঠিক কিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। রাজনীতিবিদদের দোষত্রুটি আছে, ভুলভ্রান্তি আছে, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও রাজনীতিবিদের বিকল্প কেবল রাজনীতিবিদই, অন্য কেউ নয়। অবশ্য আমি যে সময়ের রাজনীতিবিদের কথা বলছি, তখনো রাজনীতিবিদেরা আজকের মতো লুম্পেন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেননি। রাস্তার লোক রাজনীতি করে কোটিপতি—এটা হালের সংস্কৃতি। ঋণখেলাপি, কালোবাজারি, ব্যবসায়ী আর আয়ের কোনো বৈধ উৎস ছাড়াই কোটিপতি—এরাই সংসদের মেজরিটি।