শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল গ্রহণযোগ্য নয়
· Prothom Alo

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থায় একটি বিতর্কিত ও নেতিবাচক পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা শিথিল বা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার বিষয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু এ ধরনের ভাবনাই শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। এ ধরনের আলোচনা তোলার মধ্যে অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও চিন্তা কাজ করে থাকতে পারে। আমরা মনে করি, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির সুযোগ বাড়বে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বাংলাদেশে মাধ্যমিক, কলেজ ও সমপর্যায়ের প্রায় ৩৫ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানের বাজেট অনুমোদন, তহবিল সংগ্রহ, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও এই কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকে; অর্থাৎ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে হয়। সেই কমিটির শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা তাই নিছক আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
একসময় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল না। সেই বাস্তবতায় বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাই এসব পদে বসতেন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেত। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ২০২৪ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়। তখন সভাপতির জন্য কমপক্ষে এইচএসসি বা সমমানের ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে সেই মানদণ্ড আরও উন্নীত করা হয়; কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির জন্য স্নাতকোত্তর বা চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি এবং মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জন্য স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়।
এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষাবিদেরা শিক্ষা প্রশাসনে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী পদে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আলোচনা মূলত একটি পশ্চাদপসরণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে। এই আলোচনার মধ্যে আর যা–ই হোক সৎ চিন্তা নেই। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান যথার্থই বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে ‘আবারও পেছন দিকে যাওয়া’। তাঁর মতে, ইতিবাচক একটি সিদ্ধান্তকে উল্টো পথে নিয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই; বরং কীভাবে এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা যায়, সেই দিকেই সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোচনায় একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পরিচালনা কমিটির সভাপতি নিয়োগে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা না রেখে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনজনের তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে একজনকে নির্বাচনের প্রস্তাব এসেছে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব কমার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে যদি শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড তুলে দেওয়া হয়, তবে সেই ইতিবাচক উদ্যোগের কার্যকারিতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা শিথিল বা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত হবে বলে জানানো হয়েছে। নতুন সরকার যদি সত্যিই শিক্ষার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তবে পরিচালনা কমিটির সভাপতির যোগ্যতা শিথিল করার পরিবর্তে আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিত করার দিকেই নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ইতিমধ্যে অর্জিত সামান্য অগ্রগতিও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মোটেও কোনো ভালো বার্তা নয়।