ঈদের ভরসায় টিকে আছে হাতে তৈরির জুতার কারখানা

· Prothom Alo

চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব মাদারবাড়ীর সরু গলিতে ঢুকতেই ভেসে আসে আঁটার ঝাঁজালো গন্ধ। কোথাও সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ, কোথাও রাবারের তলা কাটার খসখস আওয়াজ। টিনশেড আর ছোট পাকা ঘরের ভেতরে কাঠের পাটাতন তুলে বানানো হয়েছে দোতলা কাজের জায়গা। নিচতলায় কেউ জুতার তলা কাটছেন, ওপরে কেউ ফিতা গুঁজছেন, কেউ আঠা লাগিয়ে জোড়া দিচ্ছেন।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব মাদারবাড়িতে হাতে তৈরি জুতার কারখানায় গিয়ে দেখা গেল এই চিরচেনা দৃশ্য। ঈদ সমাগত। তাই কারখানাগুলোতে কিছুটা ব্যস্ততা আছে। কিন্তু কারখানা মালিকেরা বলছেন, এই ব্যস্ততা আর আগের মতো নয়; এটি এখন মৌসুমি, অনেকটা বাঁচার লড়াইয়ের মতো।

Visit catcross.biz for more information.

হাতে তৈরি জুতার জন্য একসময় চট্টগ্রামের মাদারবাড়ি ছিল পরিচিত নাম। এখানকার কারখানা থেকে জুতা যেত নগরের টেরিবাজার, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেট, ফুটপাতের দোকান—এমনকি ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতেও। বছরের বড় সময় জুড়ে কাজ থাকত। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। কারখানা কমেছে, শ্রমিক কমেছে, অর্ডারও কমেছে। ব্যবসা টিকে আছে মূলত ঈদ মৌসুমের ওপর ভর করে।

পূর্ব মাদারবাড়ীর কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা গেল, ঈদের বিক্রির জন্য জুতা তৈরির কাজ চলছে। তবে কর্মচাঞ্চল্যের ভেতরেও স্পষ্ট ক্লান্তি। কারখানার মালিকেরা বলছেন, সারা বছরের হিসাবে এই ব্যবসায় লাভের মুখ দেখতে হলে ঈদ মৌসুমেই ভালো বিক্রি লাগবে। কারণ, বছরের অন্য সময় বিক্রি এতটাই কম থাকে যে খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

ভরসা এখন ঈদ

পূর্ব মাদারবাড়ীর একটি কারখানায় কথা হয় উদ্যোক্তা তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাতে তৈরি জুতার ব্যবসা করছেন। তাঁর কারখানায় কয়েকজন শ্রমিক জুতা বানাতে ব্যস্ত ছিলেন। তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আগে সারা বছরই কোনো না কোনো অর্ডার থাকত। এখন ঈদ ছাড়া তেমন কাজ থাকে না। রোজার মাসে কিছু পাইকারি ক্রেতা আসেন, খুচরা ব্যবসায়ীরা অর্ডার দেন, তখন কারখানায় একটু প্রাণ ফেরে। কিন্তু এই সময়টুকু ছাড়া বছরের বড় অংশই কাটে অনিশ্চয়তায়।

মোহাম্মদ পারভেজের কথাতেও একই সুর। তিনি বললেন, হাতে তৈরি জুতার ব্যবসা এখন পুরোপুরি মৌসুমি হয়ে গেছে। ঈদের আগে বাজারে কিছু চাহিদা তৈরি হয়। তখন শ্রমিকদের নিয়ে টানা কাজ চলে। কিন্তু ঈদ পার হলেই অর্ডার পড়ে যায়। দোকানিরা নতুন করে জুতা তুলতে চান না, পুরোনো মাল বিক্রিই তখন প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়।

আরেক কারখানার মালিক রুবেল হোসেনও জানালেন, ব্যবসার পুরোনো ছন্দ আর নেই। ঈদে কিছুটা বিক্রি হয় বলেই টিকে আছেন কারখানার মালিক ও শ্রমিকেরা। অন্য সময়ে যে পরিমাণ বিক্রি হয়, তা দিয়ে কারখানা চালানো কঠিন।

এখানে আগে যে কারখানাগুলোতে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করতেন, এখন সেখানে অনেক কম লোক নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। কেউ কারখানা বন্ধ করেছেন, কেউ ভাড়া বাঁচাতে ছোট জায়গায় চলে গেছেন, কেউ আবার অন্য পেশায় ঢুকে পড়েছেন।

জুতা তৈরিতে ব্যস্ত সময় যাচ্ছে কারিগরদের

ছোট হয়ে আসছে শিল্প

মাদারবাড়ীর এই পাদুকাশিল্প নতুন নয়। ১৯৮০ সালের দিকে পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় হাতে তৈরি ক্ষুদ্র পাদুকাশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরে পশ্চিম মাদারবাড়ি, নালাপাড়া, নিউমার্কেট, মোগলটুলি, বাকলিয়াসহ আশপাশের এলাকায় একের পর এক কারখানা গড়ে ওঠে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একসময় এখানে প্রায় এক হাজার কারখানা ছিল। গত কয়েক বছরে সেই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এখন নেমে এসেছে ৩২০–এ। অর্থাৎ, ক্রমেই এই শিল্পের আকার আরও ছোট হয়ে আসছে।

কারখানা কমার পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার উঠে এসেছে মালিকদের কথায়। প্রথমত, বাজারে কম দামের বিদেশি জুতার উপস্থিতি। বৈধ আমদানির পাশাপাশি চোরাই পথেও বিদেশি জুতা ঢোকার অভিযোগ আছে উদ্যোক্তাদের। দ্বিতীয়ত, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের অন্য অঞ্চলে হাতে তৈরি জুতার কারখানা গড়ে ওঠায় চট্টগ্রামের বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তৃতীয়ত, কাঁচামালের দাম বেড়েছে কয়েক দফা। আঠা, রেক্সিন, ফোম, রাবার, লেস, স্টিকার—সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি।

এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনেও। আগে এই শিল্পে কাজ করা অনেকেই এখন পেশা বদল করেছেন। কেউ গেছেন পোশাক কারখানায়, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করছেন, কেউ বিদেশে চলে গেছেন। যে শ্রমিকেরা আছেন, তাঁদেরও আয় খুব বেশি বাড়েনি; কিন্তু বাজারদর বেড়েছে দ্রুত। ফলে কারখানার সংকট আসলে মালিক আর শ্রমিক—দুই পক্ষের জীবনেই চাপ তৈরি করছে।

টিকে থাকার লড়াই

তবু মাদারবাড়ীর এই কারখানাগুলো একেবারে নিভে যায়নি। কারণ, হাতে তৈরি জুতার একটি আলাদা বাজার এখনো আছে। স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ এখনো এসব কারখানার ওপর নির্ভরশীল। ঈদ এলে সেই বাজার কিছুটা জেগে ওঠে। তখন ছোট কারখানাগুলোর ভেতরে নতুন করে প্রাণ আসে। রাত পর্যন্ত চলে সেলাই, তলা কাটা, আঠা লাগানো, প্যাকেট ভরা।

নুরুল হকের প্রতিষ্ঠানের নাম নুসরাত সুজ। তাঁর কারখানাটি ছোট পরিসরে এখনো টিকে আছে। শ্রমিক আছেন মাত্র চারজন। অথচ একসময় বড় পরিসরেই কার্যক্রম পরিচালিত হতো। নুরুল হক বলেন, এখন বিক্রি কমে গেছে। খরচ কমায়ে কোনো ভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছি।

চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি এরশাদ উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বছরজুড়ে গড় বিক্রির পরিমাণ কমেছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু জুতার দাম বাড়ানো হয়নি। সামগ্রিকভাবে ব্যবসা দিন দিন কমছে। শুধু ঈদের সময়টাতে কিছু ক্রেতা পাওয়া যায়।

Read full story at source