বনলতা এক্সপ্রেস যেন জীবনের মায়ার গল্প
· Prothom Alo

হুমায়ূন আহমেদ আমাদের কাছে এক আবেগের নাম বিশেষ করে আমরা যাঁরা নব্বইয়ের দশকে শৈশব–কৈশোর পার করেছি। ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে সামনাসামনি না চিনলেও তাঁর সৃষ্টি চরিত্ররা ছিল আমাদের একান্ত আপনজন। তাঁর সৃষ্ট বেশির ভাগ চরিত্রই টেলিভিশনের পর্দার বাইরে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল আমাদের জীবনে। সেসব চরিত্র তো এখনো কিংবদন্তি। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে প্রিয় ছিল হিমু। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখার সময় তাই কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি ছিল আমাদের ভীষণ প্রিয়। আর বাকের ভাইকে নিয়ে তো আলাদাভাবে বলার কিছু নেই। এ ছাড়া ছোট ছোট চরিত্রগুলোও হুমায়ূন আহমেদ এত নিপুণ মমতায় নির্মাণ করতেন যে তারা হয়ে উঠত আমাদের পরিবারেরই একজন। হুমায়ূন আহমেদ ঠিক এই জায়গাটায় ছিলেন সমসাময়িক অন্য লেখকদের চেয়ে আলাদা। হুমায়ূন আহমেদের লেখার প্রধান উপাদান হলো সব শ্রেণিপেশার মানুষ এবং তাদের জীবনবোধ।
হুমায়ূন আহমেদ নির্মাতা হিসেবেও ছিলেন অনন্য। আমার চোখে এখনো ভাসে ‘আগুনের পরশমণি’ ছবির শেষ দৃশ্য। যেখানে বদি সূর্যের আলো ধরতে হাত বাড়িয়ে দেয়। আমি সিনেমাবোদ্ধা নই কিন্তু এই দৃশ্যটা কেন জানি চোখে লেগে আছে। পঠিত লেখা থেকে ছবি বানানো ঝুঁকির কাজ, কারণ পাঠকের মনে লেখাটার একটা প্রতিচ্ছবি আঁকা থাকে। তাই ছবি দেখতে গিয়ে দর্শক পর্দার ছবির সবকিছুকেই মনের স্মৃতির সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করে। আর লেখাটা যদি হয় হুমায়ূন আহমেদের, তাহলে ঝুঁকির মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যায়। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবির শুরুতেই জানিয়ে দেওয়া হয় যে এটা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত। এতে মনে হয় পরিচালক যেন গায়ে পড়েই ঝুঁকিটা নিচ্ছেন।
Visit extonnews.click for more information.
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ক্যাম্বেলটাউনের ডুমারেস্ক সিনেমা হলের প্রথম শো ছিল হাউসফুল। শো শুরুর অনেক আগে থেকেই দর্শক এসে জমায়েত হতে শুরু করেন। ছবির পোস্টারের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় চলল কিছুক্ষণ। এরপর জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হলো আসল ছবি। ছবি দেখার পুরোটা সময় হলের পরিবেশ ছিল মুখর। পর্দার হাসির কোনো দৃশ্য বা সংলাপে দর্শকেরা হাসাহাসি করেছেন। আবার কোনো আবেগঘন দৃশ্যে পুরো হলে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে আসছিল। এতে করেই বোঝা যাচ্ছিল আসল উপন্যাসটার মতো দর্শক ছবিটার সঙ্গেও যেন একাত্ম হয়ে গেছেন।
প্রবাসে সপরিবার বাংলা ছবি দেখানির্মাণের প্রয়োজনেই মূল গল্পের বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো ছবিটাকে যেন আরও বেশি হৃদয়গ্রাহী করেছে। এতে মূল গল্পের বুনন যেমন জমজমাট হয়েছে তেমনি ছবিতেও দর্শক মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছেন। আমি ইচ্ছে করেই পরিবর্তনগুলো ধরিয়ে দিচ্ছি না। হলে গিয়ে দেখলেই দর্শক চমকিত হবেন। হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবসুলভ সংলাপগুলোকে অক্ষত রাখা হয়েছে। এটা খুবই দরকার ছিল। বেশ কিছু নতুন চরিত্রও সংযোজন করা হয়েছে। আর চরিত্রগুলোর কাজকর্ম এবং স্বভাবের মধ্যেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যোগ করা হয়েছে নতুন প্রজন্মের কিছু চরিত্রও যেটা এখনকার দর্শকদের ছবির সঙ্গে দ্রুতই যুক্ত করতে পারবে। ফলে আগে থেকে উপন্যাসটা আপনার পড়া না থাকলেও আপনি ছবিটা উপভোগ করতে পারবেন।
ছবি শেষে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। সব বয়সী দর্শকই একই কথা বলেছেন। ছবিটা প্রাণভরে উপভোগ করেছি। ছবিটার চরিত্রের খুশিতে হেসেছি আবার তাদের দুঃখে কেঁদেছি। আমি দেখলাম ছেলেমেয়ে–নির্বিশেষে প্রায় সব দর্শকেরই চোখের নিচেটা ভেজা কিন্তু তাদের মুখে হাসি। অনেকেই এসেছিলেন দল বেঁধে। তাদের উচ্ছ্বাস ছিল আরও বেশি। অনেকে অভিনয় নিয়েও কথা বলেন। সবার প্রশংসা ছাপিয়ে মোশারফ করিমের নামটা বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল এটা যেন মোশারফ করিমের অভিনয়জীবনের একটা নতুন মাইলফলক। অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে এসেছিলেন। এমনই এক জুটি জানালেন আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমরা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস পড়ে বড় হয়েছিলাম।
এবার আসি আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে। প্রতিটি চরিত্রই অসাধারণ অভিনয় করেছেন। ছোটরা বাস্তবে এবং কাজে আমার কাছে সব সময়ই আদরণীয়। তাই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল ছোট্ট নিতু চরিত্রের অভিনয়। নিতুর মুখের অভিব্যক্তিগুলো যেন এখনো চোখে ভাসছে। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার বিষয়টার সঙ্গে নিজেকে খুব রিলেট করতে পেরেছি। কারণ, আমার মনে আছে আমাদের সময় দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল পাশাপাশি দিনে। কিন্তু একটা থেকে অন্যটা অনেক দূরে। ভর্তি পরীক্ষায় সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠানের বাস রাতের বেলায় গিয়ে পৌঁছাতে না পারায় অনেকেই ভর্তি পরীক্ষাটা আর দিতে পারেনি। আর এই বয়সের যে আবেগ সেটা আমাকে পুরোপুরি ছুঁয়ে গেছে। বন্ধুত্ব ও প্রেমের রসায়ন যুগে যুগে এভাবেই টিকে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ডুমারেস্ক স্কয়ারের দর্শকদের একাংশআয়মান আসিব, সামিউল ভূঁইয়া আর সুস্ময় সরকার মূল গল্পের যে পরিবর্তনগুলো এনেছেন, সেগুলোর জন্য তাঁরা আলাদাভাবে ধন্যবাদ প্রাপ্য। মূল উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ভিত্তি নির্মাণে এগুলো খুবই কাজে দিয়েছে। প্রতিটি চরিত্রেরই নিজস্ব গল্প তুলে আনার বিষয়টা আমার খুবই ভালো লেগেছে। প্রতিটি চরিত্র আপাতদৃষ্টে ভালো–মন্দের খাতায় ফেলার পর যখন তাদের অতীতের গল্প দেখানো হয়েছে, তখন দর্শক আলাদাভাবে তাদের জন্য মমতাবোধ করেছেন বলেই আমার বিশ্বাস। পুরো ছবির ধারাবর্ণনায় ছিল আরেক চমক। আমার ধারণা, এটা ছবির গতিশীলতাকে ধরে রেখেছে। আর নির্মাতা যেভাবে দৃশ্যগুলোর নির্মাণ করেছেন, সেটাও দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। সব মিলিয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দেখে দর্শকদের পয়সা উশুল হয়েছে।
প্রবাসজীবনের একঘেয়েমিতে দেশের চলচ্চিত্রগুলো বাড়তি আনন্দ জোগায়। ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ কাটিয়ে এই চলচ্চিত্রগুলো আনা এবং প্রদর্শন করার জন্য আলাদাভাবে ধন্যবাদ পাবেন বঙ্গজ ফিল্মসের স্বত্বাধিকারী তানিম ভাই। ব্যক্তিগত জীবনের চড়াই-উতরাই পার করে এমন আয়োজন চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বঙ্গজ ফিল্মস ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখবে বলেই আমার দৃঢ়বিশ্বাস। পরিশেষে আমাদের চলচ্চিত্র ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়। পুরো বিশ্ব জানুক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্বন্ধে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে শেষ করছি।