পারমাণবিক হামলা হলে কতদূর পর্যন্ত এর কী কী প্রভাব পড়ে? বাঁচার উপায় আছে কি

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির পর থেকেই ইরানে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী, তা হিরোশিমা, নাগাসাকি এবং চেরনোবিলের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।

পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী ঘটনাগুলোর একটি। এর প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং কয়েক প্রজন্ম ধরে তার রেশ বয়ে বেড়াতে হয়। পারমাণবিক হামলা বা দুর্ঘটনার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী, তা হিরোশিমা, নাগাসাকি এবং চেরনোবিলের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। এদিকে সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির পর থেকেই ইরানে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এর প্রভাব আসলে কতদূর পড়ে? কতটা? বাঁচার উপায়ই বা কী?

Visit zeppelin.cool for more information.

মরূভূমিতে মার্কিন নিউক্লিয়ার বোমার ট্রায়াল

পারমাণবিক হামলার প্রভাবের ব্যাপ্তি

একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব নির্ভর করে বোমার ক্ষমতা (কিলোটন বা মেগাটন) এবং বিস্ফোরণের উচ্চতার ওপর। সাধারণ একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হলে তার প্রভাব কয়েকটি স্তরে পড়ে।

১. তাৎক্ষণিক তাপ ও আলো: বিস্ফোরণ স্থলের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে সব কিছু মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে সব কিছু মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে যায়

২. শক ওয়েভ বা শক তরঙ্গ: ১০-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ঘরবাড়ি ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে যেতে পারে।

শক ওয়েভ বা শক তরঙ্গ: ১০-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত কাজ করেতেজস্ক্রিয় বিকিরণ: এটিই সবচেয়ে মারাত্মক

৩. তেজস্ক্রিয় বিকিরণ: এটিই সবচেয়ে মারাত্মক। বাতাসের গতিপথের ওপর ভিত্তি করে তেজস্ক্রিয় কণা শত শত কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা মাটি, জল ও ফসলের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।

হিরোশিমা ও নাগাসাকি: ধ্বংসের প্রথম স্বাক্ষর

১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের এই দুই শহরে পারমাণবিক হামলায় প্রায় ২ লাখ মানুষ সরাসরি মারা যান। তবে এর প্রভাব সেখানেই শেষ হয়নি।

ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ

ব্ল্যাক রেইন (কালো বৃষ্টি): বিস্ফোরণের পর ছাই ও তেজস্ক্রিয় কণা মিশে যে বৃষ্টি হয়েছিল, তার ফলে হাজার হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণ বিকিরণে আক্রান্ত হন।

জেনেটিক পরিবর্তন: বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের (যাদের জাপানি ভাষায় ''হিবাকুশা'' বলা হয়) মধ্যে ক্যান্সার, বিশেষ করে লিউকেমিয়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তী প্রজন্মে জন্মগত ত্রুটি ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: তেজস্ক্রিয়তার ভয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমাজে একঘরে করে রাখা হয়েছিল, যা তাদের মানসিক জীবনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।

চেরনোবিল: এক অদৃশ্য শত্রু

১৯৮৬ সালের চেরনোবিল বিপর্যয় কোনো যুদ্ধ ছিল না, ছিল একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা। এর প্রভাব ছিল আরও বিস্তৃত।

তেজস্ক্রিয় মেঘ: চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তা মেঘের মাধ্যমে ইউক্রেন ছাড়িয়ে ইউরোপের বিশাল অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

চেরনোবিল বিস্ফোরন

থাইরয়েড ক্যান্সার: তেজস্ক্রিয় আয়োডিনের প্রভাবে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সারের হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

পরিবেশগত বিপর্যয়: কয়েক হাজার হেক্টর বনভূমি মারা যায় (যা ''রেড ফরেস্ট'' নামে পরিচিত) এবং মাটির গভীরে তেজস্ক্রিয়তা চলে যাওয়ায় সেই এলাকা এখনো মানুষের বসবাসের অনুপযুক্ত রয়ে গেছে।

এত বছর পরেও সেখানে নীল কুকুর জন্মায় চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে

হিরোশিমা-নাগাসাকি বা চেরনোবিল আমাদের শিখিয়েছে যে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা কোনো সীমানা মানে না। এটি কেবল বর্তমানকে ধ্বংস করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ডিএনএ-তে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। মানুষের জীবন, প্রকৃতি এবং পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করতে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের কোনো বিকল্প নেই।

পারমাণবিক বিকিরণ বা পারমাণবিক হামলার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়া কঠিন হলেও, সঠিক প্রস্তুতি ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। নিচে সুরক্ষার প্রধান উপায়গুলো তুলে ধরা হলো:

১. দূরত্ব বজায় রাখা

পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা তেজস্ক্রিয় উৎস থেকে আপনি যত দূরে থাকবেন, বিকিরণের মাত্রা তত কম হবে। বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে অন্তত কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা জীবন রক্ষার প্রাথমিক শর্ত।

মাটির নিচে থাকা কক্ষগুলো বিকিরণ থেকে সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দেয়

২. নিরাপদ আশ্রয় বা শিল্ডিং

তেজস্ক্রিয় কণা বা ''ফলআউট'' থেকে বাঁচতে ভারী দেয়াল অত্যন্ত কার্যকর।

ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বা বেসমেন্ট: মাটির নিচে থাকা কক্ষগুলো বিকিরণ থেকে সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দেয়।

পাকা দালান: ইটের দেয়াল বা কংক্রিটের ছাদ তেজস্ক্রিয় রশ্মিকে অনেকাংশে বাধা দিতে পারে। কাঁচের জানালার পাশ থেকে সরে ঘরের মাঝখানে বা দেয়ালের আড়ালে অবস্থান করা উচিত।

৩. ঘরের ভেতরে অবস্থান

বিস্ফোরণের পর অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বাইরে বের হওয়া একদম উচিত নয়। এ সময় বাতাসের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় ছাই ও ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘরের জানালা, দরজা এবং ভেন্টিলেটর ভালো করে বন্ধ করে দিতে হবে।
এয়ার কন্ডিশনার বা বাইরের বাতাস আসে এমন যন্ত্র বন্ধ রাখা জরুরি।

৪. ডিকন্টামিনেশন

যদি কোনো কারণে আপনি বাইরে থেকে ঘরে ফেরেন, তবে দ্রুত পোশাক পরিবর্তন করে প্লাস্টিক ব্যাগে সিল করে দূরে সরিয়ে রাখুন। সাবান দিয়ে শরীর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন যাতে চামড়ায় লেগে থাকা তেজস্ক্রিয় কণা দূর হয়। তবে চামড়া ঘষে ক্ষত করা যাবে না।

তেজস্ক্রিয় কণা বা ''ফলআউট'' থেকে বাঁচাটাই বড় চ্যালেঞ্জ

৫. খাবার ও পানির নিরাপত্তা

খোলা পানি বা খাবার কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না। কেবল বোতলজাত পানি এবং টিনজাত বা সিল করা খাবার খাওয়া নিরাপদ। খাবার আগে পাত্রের বাইরেটা ভালো করে মুছে নিতে হবে যাতে বাইরের ধুলো ভেতরে না ঢোকে।

৬. পটাশিয়াম আয়োডাইড ট্যাবলেট

পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন থেকে থাইরয়েড গ্রন্থিকে রক্ষা করতে চিকিৎসকের পরামর্শে পটাশিয়াম আয়োডাইড ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। এটি তেজস্ক্রিয় আয়োডিন শরীরে শোষিত হতে বাধা দেয়।

পারমাণবিক হামলা বা দুর্ঘটনা মানব সভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ হুমকি যা শুধু আক্রান্ত স্থান নয়, পৃথিবী জুড়ে অপূরণীয় ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় নিয়ে আসে। এর বিরুদ্ধে প্রতিটি দেশের নাগরিকদের যার যার জায়গা থেকে রুখে দাঁড়ানো উচিত, অবস্থান নেওয়া উচিত।

সূত্র: এম আই টি প্রেস রিডার, আইসিআরপি, পাব মেড সেন্ট্রাল, উইকিপিডিয়া

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

Read full story at source